Blog

দেরীতে কথা বলা (Speech Delayed) শিশুদের খেলনা বাছাইয়ের ১০টি টিপস
26 June,13
বিষয়টি বাংলাতে পড়ুন

একজন স্পীচ ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথলোজিস্ট হিসেবে আমার কাছে এই প্রশ্নটি প্রায়ই করা হয় যে দেরীতে কথা বলা ও ভাষা শেখা শিশুদের জন্য কী ধরনের খেলনা বাছাই করা উচিত। আজ আমি এরকম ১০টি টিপস এর কথা বলবো যাতে দেরীতে কথা বলা শিশুদের জন্য খেলনা বাছাই করতে সুবিধে হয়।

টিপস ১। ব্যাটারীযুক্ত খেলনা পরিহার করুন

আমার প্রথম পরামর্শ, ব্যাটারীযুক্ত খেলনা পরিহার করুন। যেসব খেলনায় ব্যাটারী প্রয়োজন সেসব খেলনা আপনার দেরীতে কথা বলা শিশুকে দিবেন না। অথবা যদি ব্যাটারী থেকেই থাকে তবে সেগুলো খুলে ফেলুন। দেখতে সুন্দর ব্যাটারী ছাড়া আঁটসাঁটো খেলনা কিনে দিতে পারেন। ব্যাটারীযুক্ত খেলনাতে অপ্রীতিকর আওয়াজ তৈরী করে যা আপনার বাচ্চারা হয়তো চাইছে না। এমনকি আপনিও না। সুতরাং এধরনের খেলনা দূরে রাখুন।

তবে হ্যাঁ, কিছু ব্যাতিক্রম থাকতে পারে। যেমন ধরুন খেলনা ক্যামেরা। এতে ব্যাটারী থাকতে পারে, কারন এতে বাস্তব ছবিও যেমন তোলা যায় যা আপনার বাচ্চার আনন্দের উৎস হতে পারে, তেমনি এটা বেশি শব্দও সৃষ্টি করে না। আরো কিছু যেমন খেলনা ল্যাপটপ, খেলনা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, খেলনা মাইক্রোফোন যা দিয়ে ভয়েস রেকর্ড করে শোনাতে পারেন। এগুলো আসলেই ব্যাতিক্রম। তবে বেশিরভাগ খেলনা কেনার আগে সেগুলো ব্যাটারী মুক্ত কি না তা’ দেখে নিন।

টিপস ২। এমন খেলনা বেছে নিন যার শুরু অথবা শেষ অংশ নেই

অনেকেই ভাবতে পারেন Open ended toys  আবার কি। হ্যাঁ, এগুলো এমন খেলনা যার শুরু, মধ্য বা শেষ নেই। যে কোন অংশ দিয়েই শুরু করা যায়। বিভিন্নভাবে এটাকে ব্যবহার করা যায়। এসব খেলনায় সৃজনশীলতার প্রচুর সুযোগ থাকে। ইচ্ছেমত ব্যবহারের সুযোগ থাকে। এসব খেলনা ব্যবহারে শিশুদের মৌলিক এবং বিশেষ দিকে ঝোঁক বাড়ে।

টিপস ৩। আপনার শিশুকে সনাতনি বা ট্রেডিশনাল খেলনা দিন

টিপস ২-এ যেভাবে বলা হয়েছে অর্থাৎ সনাতনি বা পুরনো দিনের বা মডেলের খেলনায় সৃজনশীলতার অনেক সুযোগ থাকে, খোলামেলা মনের হওয়ার সুযোগ থাকে। এধরনের কিছু খেলনা যেমনঃ

কাঠের ব্লক

লেগস

বাস, ট্রাক বা ট্রান্সপোর্ট টয়েস (যেগুলো খেলতে আওয়াজের দরকার নেই, সুতরাং ব্যাটারী থাকলে তা খুলে ফেলতে পারেন)

সাধারন রেলগাড়ীর ট্র্যাকসহ রেলগাড়ী (হতে পারে সেগুলো কাঠের তৈরী কিংবা প্লাস্টিকের। তবে মাঝে মাঝে তা চালিয়ে দেখাতে পারেন কিভাবে ট্র্যাকে রেলগাড়ী চলে)

খেলনা রান্নাঘর, রান্নাঘরের সরঞ্জাম আর খাবার

খামার বাড়ীর সেট বা পশু-প্রানীর খেলনা যা আপনার বাচ্চা পছন্দ করে। যেমন ডাইনোসর ইত্যাদি।

ডল হাউস

মিঃ পোটাটো হেড

প্লে ডাফ

ড্রেস আপ ক্লোথস

টুল সেট

বেবী ডল বা বেবী ব্লাঙ্কেট ইত্যাদি

টিপস ৪। ছেলেদের না মেয়েদের খেলনা দিবেন ভাবছেন? একদম চিন্তা করবে না

আপনার বাচ্চার জন্য যখন খেলনা কিনবেন, ছেলেদের খেলনা কিনবেন না মেয়েদের খেলনা কিনবেন-এটা নিয়ে ভাববেন না। আপনার মেয়ে বাচ্চাটিকে খেলতে দিন ট্রাক কিংবা রেলগাড়ী নিয়ে। ক্ষতি কি যদি আপনার ছেলে সন্তানকে টয় কিচেন কিংবা বেবী ডল নিয়ে খেলতে দেন!

খেলনা নিয়ে খেলার প্রভাব সম্পর্কে National Association for the Education of Young Children (NAEYC)  কর্তৃক পরিচালিত গবেষনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যেকোন ধরনের খেলনা দিয়ে খেলা হোক না কেন এতে বাচ্চাদের (ছেলে বাচ্চা, মেয়ে বাচ্চা উভয় ক্ষেত্রেই) সমস্যা সমাধানমূলক বুদ্ধি বাড়ে, সামাজিক কার্যকলাপে অংশগ্রহন সহজ করে, সৃজনশীল উপায়ে তারা নিজেদেরকে উপস্থাপন করতে শেখে। কিন্তু কৌতুহলের বিষয় হল যে আমরা খেলনা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এখনো ছেলের জন্য ছেলেদের খেলনা যেমন কনস্ট্রাকশন খেলনা, খেলনা গাড়ী দেই আবার মেয়েদেরকে দেই রান্না-বান্নার সামগ্রী হাঁড়ি-পাতিল কিংবা পুতুল ইত্যাদি। পুরনো ধ্যান-ধারনা থেকে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা বেরিয়ে আসতে পারি নি। কাজেই আসুন সেকেলে ধারনা বদলে ছেলে শিশু বা মেয়ে শিশু উভয়কেই সমান সব ধরনের খেলনা দিয়ে উপকৃত হবার ও খেলার সুযোগ করে দেই।

টিপস ৫। “ABCs and 123’s”  জাতীয় খেলনা বাদ দিন

আপনি যখন কোন বড় চেইন স্টোরে যাবেন আর শেলফ-এ রক্ষিত “ABCs and 123’s”  জাতীয় খেলনাগুলো দেখবেন, তখন মনে হবে এগুলোই আমার বাচ্চার জন্য প্রয়োজন। কিন্তু না। অনেকে আবার মনঃস্থির করেই যান এধরনের খেলনা কেনার। আসলে আপনার-আমার দেরীতে কথা বলা বা ভাষা শেখা বাচ্চার জন্য এখনি এধরনের খেলনার প্রয়োজন নেই। এরকম বয়সে তাদের ঝোঁক থাকে শুধুই খেলার, যেখানে একটু আলোর নাচন থাকতে পারে কিংবা কোন হালকা মিউজিক।

টিপস ৬। এমন খেলনা দিন যাতে নড়াচড়া বেশি হয়

আপনার বাচ্চার জন্য নড়াচড়া কিংবা একটু দৌড়াদৌড়ি করানো খুবই জরুরী। এমনকি ঘরের ভিতরেও। ঘরের ভিতরেই বানিয়ে দিতে পারেন ফোর্ট-টানেলস। এর জন্য কোন বিশেষ ধরনের খেলনা কেনার প্রয়োজন পড়বে না। এতে আপনার বাচ্চার মুভমেন্ট যেমন বাড়বে তেমনি সে আনন্দও পাবে। যাদের ঘরের মেঝেতে টাইলস বা শক্ত কাঠের পাটাতন দেয়া, তারা রাইড-অন-টয় কিনে দিতে পারেন। এছাড়া বল কিনে দিতে পারেন।

টিপস ৭। বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথা ভুলবেন না

ঘরের বাইরে খেলার জন্য সবসময় খেলনা দেয়ার প্রয়োজন নেই। আপনি কোন পার্কে নিয়ে যেতে পারেন, যেখানে সে ইচ্ছেমত ছোটাছুটি করতে পারবে। তারপরও কিছু খেলনা বা খেলনা সামগ্রী কিনে দিতে পারেন আউটদোর টয় হিসাবে যেমনঃ

ওয়াটার টেবিল – এক্ষেত্রে বড় পানির গামলা, ছোট পুল কিনে বা তৈরী করে দেয়া যেতে পারে।

রান্নাঘরের সামগ্রী যেমন গামলা, কাপ, চামচ ইত্যাদি

ছোট কোদাল বা বেলচা কিংবা নিড়ানি দিতে পারেন যা দিয়ে মাটি খুঁড়তে বা কোপাতে পারে।

রাইড-অন-টয়

প্লে-হাউস (যদিও এটা বেশ ব্যয় সাপেক্ষ, তবে এতে সে স্বাধীনভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা, ক্রিয়েটিভ ওয়েতে খেলতে পারবে।

টিপস ৮। ‘অল্পই’ অনেক

হ্যাঁ, ‘অল্পই’ অনেক। আপনার বাচ্চার জন্য গাঁদাগাঁদা খেলনা কেনার দরকার নেই। কারন অতিরিক্ত খেলনা অনেক সময় উলটো ফল বয়ে আনতে পারে। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন বাচ্চারা অধিক খেলনা পেলে আচ্ছন্ন বা অভিভুত হয়ে পড়তে পারে এবং এতে তাদের ছোটাছুটি কমে যেতে পারে। কারন হাতের কাছেই একটার পর একটা খেলনা!  এতে আসলে তাদের খেলাধুলাটাকে সীমিত করে ফেলে। সেই সাথে কথা বলা বা ভাষা প্রয়োগের সুযোগটাও কমে যেতে পারে। তবে অনেক সময় বিশেষ বিশেষ দিনে কিংবা তার জন্মদিনে একসঙ্গে অনেক অনেক খেলনা দেই বা সে পায়। এগুলো ব্যবহার করতে দেয়াটা বা কিভাবে কোনটার পর কোনটা দিবেন এটা নির্ভর করে আপনার উপর।

টিপস ৯। খেলনাগুলো খেলতে দিন পর্যায়ক্রমে

খেলনার প্রাচুর্য থেকে আপনার শিশুকে খেলতে দিন পর্যায়ক্রমে। সব খেলনা একবারে নয়।

টিপস ১০। মনে রাখবেন সব খেলনাই আসলে খেলনা নয়

নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে, আমরা আলোচনা করেছি সনাতনি খেলনা নিয়ে খেলতে দেয়া যেমনঃ ঘরে দুর্গের মত বানিয়ে দেয়া কিংবা বড় কোন পানির গামলায় খেলতে দেয়া ইত্যাদি। এতে প্রচুর আনন্দের পাশাপাশি ছোটাছুটি হয় অনেক বেশি, সে বেশি বেশি ভাষা ব্যবহারের চেষ্টা করে এতে, কথা বলার চেষ্টা করে। কাজেই সবচেয়ে ভাল খেলনা আসলে খেলনা নাও হতে পারে। এধরনের আরো অনেক যেমনঃ হাঁড়ি-কুড়ি, কাঠের চামচ, কার্ডবোর্ড বাক্স, কম্বল-বালিশ-কত কি!

সুতরাং, আপনার দেরীতে কথা বলা/ভাষা শেখা বাচ্চার খেলনা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বৃত্তবন্দি না থেকে নতুন নতুন কিছু ভাবুন, সৃজনশীল কিছু নিয়ে খেলতে দিন। শুধু তা-ই নয়, আপনিও হতে পারেন আপনার বাচ্চার শ্রেষ্ঠ খেলনা। আপনি আপনার বাচ্চার সাথে খেলুন, কথা বলুন, গেয়ে শোনান কিংবা তার সাথে গাইতে পারেন, মজার মজার গল্প বলুন, মজার স্বরে কথা বলুন। খেলুন আপনার বাচ্চার সাথে লুকোচুরি, আঙ্গুলের খেলা শেখান তাকে, কোলে নিয়ে খেলুন মজার মজার খেলা।

 

 

Make it favorite!

3 comments

mene - at 11 July,16

So nice l like it......

mene - at 11 July,16

So nice l like it......

Utpal Sen - at 10 February,14

i like it....

Leave a comment

 
healthprior21 (one stop 'Portal Hospital')